‘টাইপরাইটার দিয়ে কি ছবি আঁকা সম্ভব’ এই প্রশ্ন যদি করেন তবে অনেকেরই চোখ কপালে উঠবে। কিংবা যদি বলেন কম্পিউটারে শুধু কিবোর্ড দিয়ে কি ছবি আঁকা সম্ভব তাহলেও কিছুটা অস্বীকৃতি দিয়ে দিবেন অনেকেই। কিন্তু অবিশ্বাস্য সত্যি যে টাইপরাইটার বা শুধু কম্পিউটার কিবোর্ড (কোন গ্রাফিক্যাল ইউটিলিটি ছাড়া) দিয়ে ছবি আঁকা সম্ভব। এইসব অক্ষর দিয়ে বা চিহ্ন দিয়ে ছবি আঁকার ইতিহাসটি অনেক পুরোনো এবং বিস্ময়কর। টাইপরাইটার দিয়ে আঁকা কিছু ছবি আছে যেগুলো দেখলে সত্যিই অবিশ্বাস্য লাগে। টাইপরাইটার দিয়ে অঙ্কিত ছেিবকে বলা হয় টাইপগ্রাফী আর এই টাইপরাইটার নামক যন্ত্রটি দিনে দিনে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে আর সেই জায়গাটি দখল করে নিচ্ছে কম্পিউটার। কম্পিউটারে নির্দিষ্ট কিছু চিহ্ন দিয়ে যে ছবি আঁকা হয় তাকে বলে আসকি ছবি।
কম্পিউটার কিবোর্ড দিয়েও তৈরি করা যায় নানারকম ছবি কিছু নির্দিষ্ট অক্ষর বা সংকেতের মাধ্যমে। কম্পিউটিংয়ের সুবিধায় ২৫৬টি বিশেষ চিহ্ন দিয়ে একটি স্টান্ডার্ড নির্ধারন করে দেয়া হয়েছে এই স্টান্ডার্ডটির নাম আসকি (ASCII-American Standard Code for Information Interchange)। আসকি ক্যারেক্টার দুইটি ভাগে বিভক্ত, প্রাথমিক এবং বর্ধিত। সাধারনত প্রাথমিক চিহ্নগুলোকে আসকি ছবি আঁকার কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তবে বিশেষ কিছু বস্তু বা মুখের অবয়বের জন্য সবধরনের চিহ্নই ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
প্রাচীনকালে অক্ষরদিয়ে ছবি আাঁকার প্রচলন ছিল খুব ভালভাবেই। আর এই কাজটি করা হত হাতে লিখেই। অনেক পুরানা পুঁথিতে এর নিদর্শন পাওয়া গেছে। উদাহরন হিসেবে মিসরীয় হাইরোগ্লিফিক। মিসরীয় হাইরোগ্লিফিকে অক্ষর এর বদলে ব্যবহৃত হত ছবি। যা বর্তমান থ্রিডি আসকির পথিকৃত বলা যায়। আর থ্রিডি আসকি হচ্ছে আসকি ছবির সর্বশেষ সংস্করন যা এখনও অতটা জনপ্রিয়তা পায়নি। তবে অক্ষরকে ছবি হিসেবে উপস্থাপনের কৌশলটি অনেক পুরোনো। আগের দিনে টাইপরাইটারে যখন কবিতা টাইপ করা হত তখন টাইপরাইটারে কবিতার অক্ষরগুলোকে নানারকম চিত্রতে রূপান্তরিত করার একটা কৌশল ছিল। আর সেই ধারায় টাইপোগ্রাফী নামক এক পদ্ধতি আবিস্কৃত হয়েছিল। তবে টাইপরাইটার দিয়ে এই বিশেষ চিত্রকর্ম পদ্ধতির স্বীকৃতি দেয়া হয় ১৮৯০ সালে, যদিও ১৮৬৭ সাল থেকেই টাইপোগ্রাফীর প্রচলন ছিল।
১৮৯০ সালে টাইপরাইটার প্রস্তুতকারক কোম্পানি এবং সেক্রেটারিয়াল এজেন্সিগুলো মিলে একটি প্রতিযোগিতা শুরু করেছিল যার বিষয়বস্তু ছিল টাইপিং গতি এবং টাইপোগ্রাফী। সেই ধারায় ১৮৯৮ সালে ফ্লোরা স্টাচি নামের এক মহিলা, যিনি ছিলেন একজন সচিব, একটি টাইপোগ্রাফী জমা দিয়ে আলোড়ন তুলেছিলেন। ২০০ বছর পরে সেই ছবিটি দেখে আপনিও বিস্মিত হবেন। ছবিটির বিষয়বস্তু একটি প্রজাপতি যা তিনি এঁকেছিলেন প্রতিযোগিতায় বসে এবং একবারের চেষ্টায়। যা এখন পর্যন্ত পিটম্যানের ফনেটিক জার্নাল এ সংরক্ষিত আছে। পাঠকদের জন্য মূল ছবিটি এখানে সংযুক্ত করা হল। ছাপার কাজের বৈচিত্র আনতে শুরু হয় অক্ষর বিন্যাসের মধ্যে শৈল্পিকতা। উদাহরন হিসেবে অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড একটি সংস্করনের কথা বলা যায়। সেখানে ইদুরের লেজের বর্ণনামূলক অংশের লেখাটুকুকেই তৈরি করা হয়েছিল ইদুরের লেজের আকারে। এরকম আরও অনেক উদাহরন আছে।
১৯০০ সালের শুরুর দিকে একটা প্রযুক্তি আবিস্কৃত হয়েছিল, সেটি হর রেডিও টেলি প্রিন্ট বা টেলিপ্রিন্টার। সেই সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য এটি ছিল একটি চমৎকার মাধ্যম। প্রেরক কোন তথ্য পাঠাতে নির্দিষ্ট কিছু চিহ্ন এর মাধ্যমে প্রেরকযন্ত্র থেকে গ্রাহকযন্ত্রের উদ্দেশ্যে মেসেজ টাইপ করত আর তা প্রিন্ট হত গ্রাহকের টেলিপ্রিন্টারে। কিন্তু প্রেরকেরা তাদের শৈল্পিক মনের প্রস্ফুটন ঘটানো শুরু করেছিল তথ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে। টাইপকৃত তথ্যের ভিন্নতর বিন্যাসের মাধ্যমে তৈরি করা শুরু হল নানারকম চিত্রের। এই বিড়ালের অবয়বটি তারই নিদর্শন।
কম্পিউটারে সবার প্রথম আকাঁ আকিঁর শুরু হয় সেই পাঞ্চকার্ড এর আমলে। আগের দিনের সেইসব কম্পিউটারের আউটপুটের জন্য ব্যবহার করা হত পেপারটেপ। পেপারটেপ হল অনেক লম্বা কাগজের ফিতা। নানারকম প্রসেসিং এর আউটপুটগুলো সরাসরি পেপারটেপই নেয়া হত কারন তখন পর্যন্ত মনিটর
আবিস্কৃত হয় নি। কিন্তু সেইসময়ের অপারেটর/প্রোগ্রামাররা গাণিতিক সমস্যার পাশাপাশি পেপারটেপে ছবি আঁকার প্রচলন ঘটিয়েছিলেন। পেপারটেপে পাশাপাশি একগুচ্ছ অক্ষর বিন্যাস করে নানারকম চিত্র তৈরি করা শুরু করেছিল। কিন্তু পেপার টেপের প্রসারতা কম হওয়ার কারনে তা খুব স্পষ্ট হত না। ১৯৬৮ সালে আসকি’র স্টান্ডার্ড নির্ধারন করা হলে এই চিত্রকর্মের প্রসার ঘটতে থাকে।
একটি ছবির রঙের ঘনত্ব এর উপর বের করা যায় কোন যায়গায় কি ধরনের অক্ষর বসানো সম্ভব। তাই বর্তমান আসকি শিল্পীরা এই বিশেষ কৌশলটিই প্রয়োগ করেন। আর এমন করেই তৈরি করা হয়েছে বড় বড় সব বিজ্ঞানী, দার্শনিকদের আসকি ছবি। আপনি এখন থেকেই শুরু করতে পারেন আসকি আর্টের চর্চা। কারন বিষয়টি খুবই চমকপ্রদ। আপনার কিবোর্ড নিয়ে আজকেই লেগে পড়–ন। আর গাইডলাইনের জন্য নাদান ক্রিভোলিন এর আর্ট টাইপিং বইটি সংগ্রহ করুন। এই বইটি আপনাকে ধাপে ধাপে নিয়ে যাবে এক শৈল্পিক জগতে। আর আপনার ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে আপনিও হয়ে যাবেন কোন ফ্লোরা স্ট্যাচি।
আসকি ছবি তৈরি করার জন্য আরও হাজার পন্থা আছে। বর্তমানে এই ছবি তৈরি করতে ঝক্কি খুবই কম। হাজার হাজার সফ্টওয়্যার আছে যেগুলো দিয়ে মনের মতন আসকি ছবি তৈরি করা যায়। আপনার ইন্টারনেট সংযোগ থাকলে যেকোন ভাল সার্চ ইঞ্জিনে Convert Image to Picture এই কিওয়ার্ড দিয়ে সার্চ করুন আপনাকে অনেকগুলো সফ্টওয়্যারের লিস্ট দিবে। ডাওনলোড করে তৈরি করা শুরু করুন আপনার মনের মতন আসকি পিকচার। তবে একটি কথা না বললেই নয় এই সফ্টওয়্যার গুলো দিয়ে আপনি একটি কাজ খুব সহজেই করতে পারবেন তা হল কালার আসকি পিকচার। যা অনেক বেশি সুন্দর আর বিচিত্র। উদাহরন হিসেবে ড্যানিয়েল হফম্যানের পিক২টেক্সট সফ্টওয়্যারটির কথা বলা যায়। এই সফ্টওয়্যারটির আছে অস্বাধারন আসকি ছবি তৈরি করার ক্ষমতা। আপনার ইন্টারনেট কানেকশন থাকলে এই সফ্টওয়্যারটি ডাউনলোড করে নিন। সাইট হল http://www.pic2txt.de ; সফ্টওয়্যারটি ডাউনলোড হলে রান করুন সফ্টওয়্যারটি। সাধারনত সফ্টওয়্যারটি জিপ অবস্থায় থাকে তাই আপনাকে আনজিপ করে ব্যবহার করতে হবে। আর এই আনজিপ করার জন্য যেকোন কমপ্রেশন সফ্টওয়্যার ব্যবহার করুন যেমন উইনজিপ (িি.িরিহুরঢ়.পড়স)। সফ্টওয়্যারটির নীচের দিকে ছবি ব্রাওজ করার একটি অপশন আছে। আপনি একটি ছবি বাছাই করুন। খেয়াল রাখবেন ছবিটি যেন ছোট আকারের হয়। এবার ব্রাউজ বাটনটির পাশে অবস্থিত প্লে বাটনটি প্রেস করুন। কিছুক্ষনের মধ্যে আপনার ছবিটিকে আসকি ছবিতে রূপান্তরিত করে ফেলবে। ছবিটিকে সেভ করে বন্ধুদের দেখান। আসকির ধারায় আরও বেশ কিছু পিকচার ফরম্যাট রয়েছে যথা ইউনি পিকচার, এওএল ম্যাক্রো আর্ট।
আসকি ছবির শেষ সংস্করন হল থ্রিডি আসকি পিকচার যা দেখে আপনার মিসরীয় হাইরোগ্লিফিক এর কথা মনে পড়ে যাবে। একটি অক্ষরের নানারকম উপস্থাপন এবং আলো-আঁধারিতে পরিবর্তিত হয় এই ছবির। তবে এই চিত্রকর্মগুলোর ধারা অনেক বেশি চিত্র নির্ভর তাই এটি এখনও টাইপোগ্রাফীর মতন জনপ্রিয় হয়নি। তবে এটি নিয়ে বর্তমানে বিস্তর কাজ চলছে, হয়ত অচিরেই এর কোন স্টান্ডার্ড আমরা দেখতে পারব।
বর্তমানে মোবইল ফোনের এস.এম.এস সার্ভিসেও ব্যবহারকারীরা নানাধরনের ছবি নিয়ে কাজ করে থাকেন যা অনেক দৃষ্টিনন্দন। আবার ইন্টারনেট চ্যাটিং সফ্টওয়্যার এম.আই.আর.সি তেও একধরনের ছবির পপআপ ব্যবহার করা হয়ে থাকে এবং তাও প্রসংসার যোগ্য।
প্রযুক্তির লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের কাজকর্ম সহজ করে দেয়া আর শিল্পের মধ্যে থাকে সহজ কাজগুলোকে অন্যভাবে উপস্থাপন করে মানুষকে আনন্দ দেয়া। যদিও আসকি ছবি আঁকার অনেক ঝক্কি কিন্তু এটি আপনাকে দিতে পারে অনাবিল আনন্দ। তাই বিলম্ব না করে চলে আসুন আসকির এই বিশাল চিত্রজগতে। আপনার সার্চ ইঞ্জিনে সার্চ করলে অনেক আসকি পিকচারের উদাহরন দেখতে পারবেন।
One Response to “অক্ষর চিত্রঃ একাল-সেকাল”
লেখাটির সম্পর্কে মন্তব্য করুন
You must be logged in to post a comment.
July 3rd, 2007 at 3:57 am
লেখাটি ২০০১/২০০২ (মনে করতে পারছি না) দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয়েছিল।