পরিবেশবান্ধব জ্বালানির পেছনে গুগল ঢালছে কোটি কোটি ডলার বাজারে লজিট্যাক ব্র্যান্ডের কী-বোর্ড ও মাউস
Nov 30

igf-logo.gifইন্টারনেট শাসন বা ইন্টারনেটের পরিচালন-পদ্ধতি কী হবে−এ নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ইন্টারনেটের সব কার্যকলাপ মার্কিন সংস্থা আইকানের নিয়ন্ত্রণে। একক নিয়ন্ত্রণ ইন্টারনেটের সর্বজনীন ও সর্বগামী ব্যবহারের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে এমন আশঙ্কা থেকেই বিতর্ক। বিভিন্ন দেশ চাচ্ছে এর সর্বজনীন ব্যবহার নিশ্চিত করতে। তাই তো তিউনিসে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের তথ্য সমাজ শীর্ষ সম্মেলনের চুড়ান্ত পর্বে গঠন করা হয় ইন্টারনেট গভর্নেন্স ফোরাম।এ ফোরাম বিভিন্ন দেশ, বিভিন্ন পক্ষের মতামত নিয়ে ইন্টারনেট শাসনের একটি সর্বজনীন নীতিমালার সুপারিশ করবে।সম্প্রতি ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত হলো আইজিএফের দ্বিতীয় সভা। ২০০৩ সালের জেনেভা তথ্য সমাজ শীর্ষ সম্মেলনের অমীমাংসিত ‘ইন্টারনেট শাসন’ অর্থাং ইন্টারনেট গভর্নেন্স বিতর্ক ২০০৫ সালে তিউনিস শীর্ষ সম্মেলনে চুড়ান্ত রূপ নেয় ‘ইন্টারনেট গভর্নেন্স ফোরাম’ বা আইজিএফ গঠনের মাধ্যমে। প্রকৃতপক্ষে, আইজিএফ ইন্টারনেট শাসনবিষয়ক রাষ্ট্রপুঞ্জের বিতর্ককে আরও বিস্তৃত করে। যদিও মনে করা হয়েছিল এর মাধ্যমে বিষয়টির আপাত মীমাংসা হলো ও ফোরাম ক্রমাগত আলোচনার মধ্যে দ্রুত এর সহজ সমাধানের পথ তৈরি করে দেবে। উল্টোদিকে আইজিএফের ম্যান্ডেট বা কার্যপরিধি কেবল গুরুত্ব দিয়েছে সুপারিশ প্রণয়নে, কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ভুমিকা ওখানে রাখা হয়নি।

আইজিএফ বিতর্ক কী নিয়ে?
আমরা জানি যে ইন্টারনেট পরিচালনায় প্রধান ভুমিকা হলো এর বিভিন্ন ওয়েবসাইট, ই-মেইল বা ইন্টারনেট প্রটোকলের ঠিকানা। ইন্টারনেটের মৌলিক ব্যবহারে এই ঠিকানা কিনে নিতে হয়। তথ্যপ্রযুক্তির বর্তমান পর্যায়ে সংখ্যাবাচক (নিউমেরিক) ও ঘোষণাবাচক (এক্সপ্রেসিভ) ঠিকানার সমন্বয়কের মূল দায়িত্ব পালন করে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বাণিজ্যিক কোম্পানি− যার নাম ইন্টারনেট করপোরেশন ফর অ্যাসাইন্ড নেমস অ্যান্ড নাম্বারস বা ‘আইকান’। তথ্যপ্রযুক্তির ক্রমপ্রসার, উৎকর্ষ ও ইন্টারনেটের ইতিবাচক সুফল ব্যবহারে এই প্রতিষ্ঠানের নাম-ঠিকানা ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণের যাবতীয় ক্ষমতা এককভাবে কুক্ষিগত থাকবে, এটি অন্য দেশগুলো বা খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অনেকে মানতে নারাজ। মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রবক্তা দেশের এই প্রতিষ্ঠান কিছুতেই তার এ ব্যবসা হারাতে রাজি নয়, আর তার পাশে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। বিশেষ করে দুরনিয়ন্ত্রণ মহাকাশব্যবস্থায় বাণিজ্যিক স্বার্থকে সমন্বয় করে মার্কিন অর্থনীতিতে ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ ব্যবসা যেখানে অন্যতম মুখ্য ভুমিকা পালন করছে, সেখানে এর ভুমিকা গঠন হয়ে পড়ুক তা যুক্তরাষ্ট্র সহজে চাইবে না।
নাম-ঠিকানা ও এর মহাকাশ-অবস্থানের মৌলিক এবং কারিগরি পরিধির নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও অন্যান্য বিতর্কের কারণগুলো হলো−এসবের ব্যবহারিক মূল্য নির্ধারণ, মূল্য নিয়ন্ত্রণ, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের বিপরীতে আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণে বা ঠিকানা তৈরি, সহজ অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রতিবন্ধকতা বজায় রাখা। সর্বোপরি ইন্টারনেট ব্যবস্থাপনাকে সর্বজনগ্রাহ্য আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনা কাঠামোতে নিয়ে যেতে সর্বাত্মক আপত্তি সৃষ্টি।

জাতিসংঘের ভুমিকা
তথ্য সমাজ শীর্ষ সম্মেলনের প্রথম পর্যায়ের অমীমাংসিত বিতর্ককে চুড়ান্ত বিতর্কের সহজ সমাধান দেন তংকালীন মহাসচিব কফি আনান। তিনি সব দেশকে এই বিতর্কে ক্রমাগত অংশগ্রহণের আহ্বান জানান তিউনিস পর্বে। আইজিএফ গঠন করে তিনি ঐতিহাসিক এক পটভুমি তৈরি করে দেন জাতিসংঘের অন্যান্য সহায়ক শক্তিকে। যেমন−সুশীল সমাজ, ব্যবসায় সমাজ ও সংবাদমাধ্যমকে এই বিতর্কে অংশগ্রহণের সম্মিলিত মর্যাদা দেন, যাতে এই চারপক্ষ বিষয়টির খুঁটিনাটি পর্যালোচনা করে দেশগুলোকে আরও গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথনির্দেশ তৈরি করে দিতে পারে। উল্লেখ্য, তিউনিস ঘোষণাপত্র ও কর্মপরিকল্পনায়ও এ বিষয়টি যুক্ত হয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিবের দপ্তর এই বিতর্ক সভার অভিভাবকত্বও গ্রহণ করে।

আইজিএফ বিতর্কের প্রথম সভা
এথেন্স ২০০৬
গ্রিসের রাজধানী এথেন্সে আইজিএফের প্রথম সভা ২০০৬ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় মূল আলোচনা ছিল এর কার্যপরিধি সুনিয়ন্ত্রণ ও বিষয়বস্তু (কনটেন্ট) নির্ধারণ নিয়ে। দুটি বিষয়ের সমাধান মেলে এথেন্স বিতর্কে। আইজিএফ তার অভ্যন্তরীণ মেরুকরণের ঝুঁকি এড়াতে বৃহত্তর পরিধিতে কাজ করবে, যাতে ফোরাম যথেষ্ট পরিমাণে সংগঠিত হয়ে বিকাশের পথ পায়। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণে আইজিএফ বিতর্ক সভাগুলো আরও বেশিসুযোগ তৈরি করে দেবে, যার প্রতিফলন পরবর্তী সভাগুলোতে পাওয়া যাবে।

আইজিএফ বিতর্কের দ্বিতীয় সভা
রিও ডি জেনেরিও ২০০৭
ব্রাজিলের রাজধানী রিও ডি জেনেরিওতে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হলো আইজিএফের দ্বিতীয় সভা। প্রথম সভার কার্যপরিধির বিশ্লেষণ অনুযায়ী এবারের সভায় প্রায় ১০০টি কর্মশালা, সেমিনার ও সমান্তরাল অধিবেশনের আয়োজন করা হয়। দেশগুলো মূল পরিকল্পনা সভায় অপেক্ষা করেছে এর আগে অনুষ্ঠিত কর্মশালাগুলোর প্রতিবেদন পেতে। পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হয়েছে সফল কিছু উদাহরণ নিয়ে এক প্রদর্শনী।

আইজিএফের বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু
রিও-তে অনুষ্ঠিত আইজিএফ সভায় ইন্টারনেট গভর্নেন্স বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু আবর্তিত হয়েছে ইন্টারনেটকে কেন্দ্র করে কী কী সম্পদ সম্পৃক্ত, সে সবের ওপর। আর এই সম্পদের ব্যবস্থাপনায় বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলো কী ধরনের অভিজ্ঞতা ও প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছে, তা চিহ্নিত করা হয়েছে এ সভায়। চিহ্নিত বিষয়গুলোর ওপর ভিত্তি করে ইন্টারনেট শাসন পদ্ধতির বিদ্যমান ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন বা পরিমার্জনের সুপারিশপত্র তৈরি করা হয়েছে এবারের সভায়। ফলে অন্তত এই একটি জরুরি ক্ষেত্রে সর্বজনীন বাস্তবতার রূপরেখা পাওয়া গেছে। তা ছাড়া শিশুদের জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট জগং, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য ইন্টারনেটের সুশাসনকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সুপারিশমালা তৈরি হয়েছে, যা ক্রমান্বয়ে একটি আন্তর্জাতিক সহনশীল সুশাসন পদ্ধতির দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে পারছে। ফলে সবার সুপারিশ কোনো একক কর্তৃত্বের বিপরীতে কতটা শক্তিশালী ভুমিকা রাখতে পারবে, তা-ই এখন এক নতুন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। এই বিতর্কে আইজিএফের প্রথম জয় ডট ট্রিপল এক্স (.xxx) ডোমেইন ঠিকানা বরাদ্দ থেকে আইকানকে বিরত রাখতে পারা।

বাংলাদেশ ও আইজিএফ
তথ্য সমাজ শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ সর্বোচ্চ পর্যায়ের হয়ে থাকলেও এর কার্যকরী প্রভাব দেশের নানামুখী কর্মকান্ডে দেখা যায়নি। বাংলাদেশের কোনোভাবেই জাতিসংঘের মৌলিক বিতর্কের পরিধি থেকে নিজেকে দুরে সরিয়ে রাখা উচিত নয়। আন্তর্জাতিক বিতর্কে সক্রিয় অংশগ্রহণ দেশের মেধাচর্চার জন্য যেমন সহায়ক, তেমনি বৈশ্বিক ও সর্বজনীন সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের সংহতি প্রকাশ, সমর্থন দান দেশের ভাবমূর্তিকে সমুজ্জ্বল করে। বিশেষ করে আইজিএফ বিতর্কে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের শিক্ষাবিদ ও ব্যবসায়ী সমাজের অংশগ্রহণ সরকারি খাতের জন্য সম্পুরক ভুমিকা পালন করতে পারে। আগামীতে আইজিএফ সভা দিল্লি ও কায়রোতে অনুষ্ঠিত হবে যথাক্রমে ২০০৮ ও ২০০৯ সালে। সরকার এখনই উদ্যোগী হলে বিশ্ব বিতর্কে বাংলাদেশ সক্রিয় থাকবে এবং তার প্রতিফলন অবশ্যই দেশে তথ্যপ্রযুক্তি উন্নয়ন খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেখা যাবে।
তথ্যসূত্র:দৈনিক প্রথম আলো



লেখাটির সম্পর্কে মন্তব্য করুন

You must be logged in to post a comment.